১০ নভেম্বর ১৯৯০ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাস

এড. মোয়াজ্জেম হোসেন বাবুল: ১৯৮২ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারী স্বৈরাচার এরশাদ তার সামরিক চেহারা নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্তরে সাধারণ ছাত্র সমাজের উপর ঝাপিয়ে পড়ে। এক লোমহর্ষক নিপীড়ন নির্যাতনের অভিযান চলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের উপর। বিভিন্ন হলে হলে হামলা করে ছাত্রদের আটক করে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পুলিশ ক্যাম্পের কাছে আটক করে নির্যাতন চালায়। সারা দেশের ছাত্র সমাজ বিক্ষোভে ফেটে পরে স্বৈরাচার হিসাবে ঘোষণা করে এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় হয়ে উঠে। সামরিক শাসনের যাতাকল ও শক্ত হতে থাকে। ইতিহাসের চাকা বিবিধ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সামনে চলতে থাকে। বিভিন্ন চড়াই উৎরাই পেরিয়ে রাজনীতি, ঘরোয়া রাজনীতির বেড়াজাল অতিক্রম করে ১৯৮৬ সালে জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রক্রিয়া আরম্ভ হয়। এরশাদ সরকার বিরোধী অঙ্গনের দুই শক্তি আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নির্বাচনী গনতন্ত্রকে সুসংহত করার লক্ষ্যে নির্বাচনে অংশ গ্রহণের অঙ্গীকার প্রকাশ করে। সর্বদিক থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার একটি পর্যায়ে তখনকার সময়ে সাংগঠনিক ভাবে দুর্বল বি.এন.পি হঠাৎ করে নির্বাচন থেকে দূরে সরে দাঁড়ায়। বাধ্য হয়ে নির্বাচনে অংশ গ্রহণের ঘোষণাকারী দল হিসাবে আওয়ামী লীগ গণতান্ত্রিক রাজনীতির প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে ১৯৮৬ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। নির্বাচনে ব্যাপক সন্ত্রাসী কারচুপির কাছে আওয়ামী লীগ পরাজয় বরণ করে। তখনি আন্দোলনের দানা বাঁধতে থাকে, সমস্ত দেশ ও জাতির কাছে এরশাদ স্বৈরাচারের চেহারা সুস্পষ্ঠ হয়ে উঠে। গণতান্ত্রিক রাজনীতির বলয়ে আওয়ামী লীগ ভিতরে বাহিরে আন্দোলন সংগ্রাম করার সিদ্ধান্ত নিয়ে এগিয়ে যায়। বি.এন.পি দুর্বল থেকে দুর্বল হয়ে পড়ে। অথচ যদি সেদিন নির্বাচনে অংশ নিতো তবে বাংলাদেশ ১৯৮৬ সাল থেকে গণতান্ত্রিক রাজনীতির উন্মোষের মাধ্যমে জাতি গণতান্ত্রিক ভাবে অনেক বেশী সুসংহত হতে পারতো।

এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে ভিতরে বাইরে আন্দোলনের সফলতা পর্যবেক্ষণ করে এক সময় বি.এন.পি রাজপথের আন্দোলনে শর্ত সাপেক্ষে একটি ঐক্য গড়ে তোলে। আওয়ামী লীগ সংসদ থেকে বেরিয়ে এসে রাজপথের আন্দোলনকে সক্রিয় করে তুলে। জনগণ আওয়ামী লীগের গৃহীত সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানায়। ১৫ দলীয় জোট আওয়ামী লীগের আর ৭ দলীয় জোট বি.এন.পি’র নেতৃত্বে রাজপথে অবস্থান নেয়। এদেশের ছাত্র সমাজও ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাজপথে নেমে আসে।

স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলন বেগবান হতে থাকে অপরদিকে এরশাদের স্বৈরাচারী রূপ বিকট আকার ধারণ করতে থাকে। ট্রাচাপা দিয়ে সেলিম দেলোয়ার হত্যাকান্ড রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রনেতা শাহাজান সিরাজ হত্যাকান্ড, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্ত্বরে রাউফুন বসনিয়া হত্যাকান্ড আন্দোলনকে চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত করে। বহু নেতাকর্মী ইতিমধ্যে কারাবাসে নিমজ্জিত হয়, বহু মামলা মোকদ্দমার শিকার হতে থাকে। ১৫ দলীয় জোট দলগত ভাবে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এবং ৭ দলীয় জোট দলগত ভাবে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে লড়াই সংগ্রাম আন্দোলন চালাতে থাকে। এই সময়ে ঐক্যবদ্ধভাবে ঘোষনা আসে ১০ নভেম্বরের ১৯৯০ সালের সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচী। শেখ হাসিনার নির্দেশে ১৫ দলীয় জোট ব্যাপকভাবে আন্দোলন আরম্ভ করে ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোকে ডাক দেয়া হয়। ময়মনসিংহ থেকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ঢাকা সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচীতে ট্রেন নতুন বগি সম্বলিত একটি ট্রেন দখল করে রাতেই রওনা হই। এবং আমি তৎকালীন ময়মনসিংহ জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি/কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের আর্ন্তজাতিক বিষয়ক সম্পাদক হিসাবে সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের অন্যতম সমন্বয়ক হিসাবে আগের দিন ঢাকা থেকে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের নির্দেশ ও আন্দোলন সংগ্রামে কর্মপন্থা নির্ধারণ করি। সারারাত বিভিন্ন ইউনিটের নেতা কর্মীদের একত্রিত করে সেদিন ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মরহুম শামছুল হক এম.পি এবং জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ মতিউর রহমানের নেতৃত্বে সারারাত একটি মেইল ট্রেনকে নিয়ন্ত্রনে নিয়ে ময়মনসিংহ রেল ষ্টেশনে ১৫ টা বগি সংযোজন করে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেই। ট্রেনের চালককে নিয়ন্ত্রন করছিলাম আমি। ভোর ৬ টার দিকে আমরা কমলাপুর ষ্টেশনের অদূরে পুলিশ কমলাপুর ষ্টেশনে আমাদের বাঁধা দিতে পারে এমন ধারনা পোষন করে খিলগাঁও বাগিচায় ট্রেন থামিয়ে নেমে পড়ি। সেখান থেকে আমরা ছাত্র জনতা বিশাল মিছিল নিয়ে এগিয়ে যেতে থাকি। ঢাকা শহরের সকালে ঘুম থেকে উঠা মানুষ আবার মিছিলের গগণ বিদারী শ্লোগানে ঘুম ভাঙ্গা জনগন বিভিন্ন স্থান থেকে হাত-তালি দিয়ে আমাদেরকে স্বাগত জানিয়ে উৎসাহিত করতে থাকে। এক পর্যায়ে আমাদের মিছিল মতিঝিল বিমান অফিস বলাকা ভবনের সামনে গিয়ে হাজির হলে পুলিশ ৩ দিক থেকে আমাদের মিছিলকে প্রতিরোধ করে। মিছিলকারীদের অনেকেই ট্রেন থেকে নেমে রেলপথের পাথর নিয়ে এসেছিল। শুরু হয়ে যায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। পাথর ছোড়ার সামনে পুলিশ টিকতে না পেরে পিছিয়ে পড়ে, মিছিলকারী আমরা বিভিন্ন পথ ধরে নিজেদের নিরাপদ করি।

আমি মিছিলের একটি বিরাট অংশ নিয়ে শ্লোগান দিতে দিতে বঙ্গবন্ধু এভিনিউ আওয়ামী লীগ অফিসের সামনে গিয়ে উপস্থিত হই। সেখানে আমার সাথে দেখা হয় বর্তমান বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সাহেবের সাথে। তিনি আমাদের মাঝে সংগ্রামী চেতনা লক্ষ্য করেন এবং মিছিলকারীদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য দিয়ে একটু অপেক্ষা করে ট্রাক দিয়ে লাঠি আসার কথা জানান, তারপর গজারীর লাঠি হাতে মিছিল নিয়ে জিরো পয়েন্ট দিয়ে সচিবালয়ের দিকে যেতে বলেন। এই সময় ট্রাক যোগে লাঠি আসার পর আমরা সবাই লাঠি হাতে বঙ্গবন্ধু এভিনিউ জি.পি.ও’র সামনের রাস্তা দিয়ে ঘুরে জি.পি.ও মোড় পর্যন্ত মিছিল করতে থাকি। এই সময় লক্ষ্য করি “গণতন্ত্র মুক্তি পাক, স্বৈরাচার নিপাত যাক” মুখে পিঠে লিখা একজন যুবক নিজে শ্লোগান দিয়ে ৩০/৪০ জনের একটি মিছিল নিয়ে আমাদের মিছিলে যোগ দেয় মুহু মুহু শ্লোগান চলতে থাকে। এভাবে ২/৩ ঘন্টা চলে যায়। এমন সময় আমাদের কাছে সংবাদ আসে আমাদের মহান নেতা আন্দোলনের অগ্নিবীনা চেতনাধারী শেখ হাসিনার গাড়ী ক্রেন দিয়ে উপরে তুলে নিয়েছে পুলিশ। মিছিলকারীদের মাঝে ব্যাপক উত্তেজনা দেখা যায়। আমি তখন আমাদের আন্দোলনকারীদের নিয়ে জিরো পয়েন্টে অবস্থান করছিলাম। এমন সময় আমার সাথে থাকা ভিপি রিপন বললো সবাই সচিবালয়ের দেয়াল ভাঙ্গার জন্য যাচ্ছে, তখন বিশাল একটি মিছিলসহ দৌড়ালাম সচিবালয়ে দেয়ালের কাছে। একজনের হাত থেকে একটি হ্যামার নিয়ে নিলাম। আমি দেয়াল ভাঙ্গার কাজ করতে আরম্ভ করলাম। আমার সাথে এমন আরো বেশ কয়েকজন ছিল।

এক সময় গুলির শব্দ শুনি- একটু পিছিয়ে আমার জিপিও সামনে চলে আসি। তখন ভীষন উত্তেজনা আর শ্লোগান। বার বার শ্লোগন হচ্ছিল- “এরশাদের গদিতে আগুন জ্বালো এক সাথে, শেখ হাসিনার কিছু হলে জ্বলবে আগুন ঘরে ঘরে”। খুব কাছে গিয়ে দেখি বুকে পিঠে লিখা “গণতন্ত্র মুক্তি পাক, স্বৈরাচার নিপাত যাক” যুবক গুলিবিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়েছে। রক্তাক্ত অবস্থায় কয়েকজন তাকে হাসপাতালে নিয়ে চলে যায়। মিছিলের উত্তেজনা বাড়তে থাকে। পুলিশ রাজপথ ছেড়ে সচিবালয়ের ভিতরে চলে যায়। পুলিশের উপর জনতার হামলা চলতেই থাকে। এক সময় ধীরে ধীরে মিছিল কিছুটা স্থিমিত হয়ে আসে। আমি বায়তুল মোকারম এর গেইটের সামনে রাস্তায় আমাদের সংগ্রামী বন্ধুদের নিয়ে বসে পড়ি। তখন জানতে পারি সেই যুবকের নাম “নূর হোসেন” সে যুবলীগের সদস্য। এমন সময় বায়তুল মোকারমের সামনে দেখি আমাদের নেতা অধ্যক্ষ মতিউর রহমান কয়েক জনকে নিয়ে বসে আছেন- আমরা সবাই তাঁর কাছে যাই। আমাদের নেতা মতিউর রহমান স্যারকে নিয়ে কমলাপুরের দিকে না গিয়ে তেজগাঁও স্টেশনের দিকে রওনা দেই হেটে হেটে। কমলাপুরের দিকে তখন পুলিশ ও জনতার সংঘর্ষ চলছিল- আগুন জ্বলছিল সেখানেও একদফা পুলিশের সাথে আমাদের সংঘাত বাধে, টিয়ারশেল ও কাদুনী গ্যাসে আমি সহ বেশ কয়েকজন আহত হই। এরপর জানতে পারি আমাদের কয়েকজন ফুলপুরের ছাত্রনেতা সালামসহ প্রায় ৩০ জন গ্রেফতারের খবর। তারপর রাত ১০টার দিকে ময়মনসিংহে এসে ময়মনসিংহ রেলওয়ে স্টেশনে আগুন ধরিয়ে দিয়ে মিছিল করে শহরে প্রবেশ করি। শহরের মাঝে জাতীয় পার্টির নেতা এডভোকেট শামছুদ্দিন আহমেদ সুরুজ মিয়ার চেম্বার জ্বালিয়ে দিয়ে সগৌরবে মিছিল নিয়ে আনন্দমোহন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ চত্ত্বরে ফিরে যাই। সেদিনের যুবলীগের কর্মী নূর হোসেনের আত্মত্যাগ জাতি আজও শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে। এদেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শেখ হাসিনা একটি চেতনার নাম। যখনি কোন অগণতান্ত্রিক শক্তি গণতন্ত্রকে নস্যাৎ করার পায়তারা করেছে তখনি শত ষড়যন্ত্র উপেক্ষা করে জীবনের মায়া তুচ্ছ করে ডাক দিয়েছেন লড়াই, সংগ্রামের, যার শরীরে জাতির জনকের রক্ত প্রবাহমান, তার সাহসী ও সমপোযোগী সিদ্ধান্তে দেশ আজ গণতান্ত্রিক উন্নয়ন মুখী বিশ্ব দরবারে জাতি হিসাবে আমাদের অনন্য সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত করে চলেছেন। প্রিয় নেত্রীর সফলতার অন্য নাম গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি- “জয়তু শেখ হাসিনা”।-লেখক: সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, ময়মনসিংহ জেলা।

প্রকাশিত লেখা লেখকের নিজস্ব ব্যক্তিগত বক্তব্য বা মতামত।